সুর ও সৌন্দর্যের আইকন আঁখি

0

সম্প্রতি দক্ষিণ কোরিয়ায় সফলতার সঙ্গে শো শেষ করে দেশে ফিরেছেন দীর্ঘদিন ধরে জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা কণ্ঠশিল্পী আঁখি আলমগীর। দুই যুগ ধরে দেশীয় সঙ্গীতাঙ্গনে দোর্দন্ড প্রতাপের সঙ্গে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি। সুরের রাজকুমারী হিসেবে খ্যাত এই সংগীত তারকার দীর্ঘ ক্যারিয়ারে কখনও এতটুকু ছন্দপতন ঘটেনি। সুরের প্রতিভা আর সৌন্দয্যের সম্মিলনে তিনি হয়ে উঠেছেন সংগীতের একজন আইকন। ক্যারিয়ারের লম্বা সময়ে অসংখ্য সুন্দর ও জনপ্রিয় গান শ্রোতাদের উপহার দিয়েছেন এই স্বপ্ন সুন্দরী। আর তার স্পেশালিটি যদি উল্লেখ করতে হয় তাহলে তিনি হলেন স্টেজ কুইন। স্টেজ পারফরমেন্সে তার জুড়ি মেলা ভার। সাম্প্রতিক সময়ের কিংবা এই প্রজন্মের অনেক সুন্দরী ও মেধাবী গায়িকাও মঞ্চে আঁখির পাশে ম্যাড়ম্যাড়ে, পানসে, অনুজ্জ্বল। তাই দুই যুগেও সমান জনপ্রিয় আঁখি।

১৯৯৪ সালে প্লেব্যাকে কণ্ঠ দেওয়ার মাধ্যমে সঙ্গীতাঙ্গনে পা রাখেন আঁখি আলমগীর। বাবা আলমগীর চলচ্চিত্রের বড় তারকা হওয়ার কারণে শুরু থেকেই আলোচনায় ছিলেন তিনি। কিন্তু মেধা ও যোগ্যতায় স্বতন্ত্রভাবে নিজের সেলিব্রিটি ইমেজ তৈরি করতে খুব বেগ পেতে হয়নি তাকে। আঁখি যখন ব্যস্ত সঙ্গীত তারকায় উপনীত হলেন তখন দেশীয় সংগীতে বড় ধরনের একটা পরিবর্তন আসে। অডিও ইন্ডাস্ট্রিতে ব্যাপক বাণিজ্যিক প্রসার ঘটে। তার সমসাময়িক অনেক সংগীত তারকাই সঙ্গীতাঙ্গনের এই পরিবর্তনে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। বাণিজ্যিকভাবে গান করার প্রচলন শুরু হওয়ার উল্লেখযোগ্য সময় ছিল সেটা। এরপর মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি অনেক বছর চাঙ্গা ছিল বাণিজ্যিকভাবে। শ্রোতারাও পেয়েছে বিভিন্ন শিল্পীর অসংখ্য শ্রুতিমধুর ও চমৎকার সব গান। কিন্তু বর্তমান সময়ে এসে অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়েছে অডিও ইন্ডাস্ট্রি। এই স্থবিরতায় অনেক জনপ্রিয় শিল্পী হারিয়ে গেছেন পর্দার আড়ালে। কিন্তু নব্বই দশকের এক ঝাঁক তারকা শিল্পীর মধ্যে বলা চলে একমাত্র আঁখি আলমগীরই টিকে আছেন দাপটের সঙ্গে।

এই টিকে থাকা কিংবা জনপ্রিয়তা ধরে রাখার পিছনে নিয়ামক হিসেবে কোন বিষয়টি কাজ করেছে? এমন প্রশ্নের জবাবে সুরের রাজকুমারী আঁখি বলেন, ‘আমি কখনও আমার ট্র্যাক থেকে বের হইনি। গানের মাঝেই সব সময় ছিলাম। মনযোগ দিয়ে গান করেছি। গানকে কখনও ঠকাইনি। শ্রোতা-দর্শককেও ঠকাইনি। তাই গানও আমাকে ঠকায়নি। পেয়েছি শ্রোতা-দর্শকদের ভালোবাসা। পাশাপাশি নিজেকে কখনও বড় ভাবিনি। তারকাখ্যাতি আমাকে গ্রাস করতে পারেনি। তাই এখনও আমি সাবলিলভাবে গান করে যাচ্ছি।’

আপনার ক্যারিয়ারের দুই যুগ সময়ের মধ্যে আমাদের সঙ্গীত দফায় দফায় অনেক চেঞ্জ হয়েছে। বদলেছে শ্রোতা-দর্শকের রুচি। এমনকি টেকনোলজির দিক থেকেও ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। তো, এতকিছুর সঙ্গে মানিয়ে এগিয়ে যাওয়াতো অনেক কঠিন বিষয়?

ইদানীং অনেকের মধ্যেই এক সঙ্গে অনেক কিছু করার একটা মনোভাব কাজ করে। একই ব্যক্তি একসঙ্গে অনেক কিছু হতে চান। যে কারণে ফোকাসটা ঠিকমত হয়না। আমি কিন্তু বরাবরই একজন সঙ্গীত শিল্পী হতে চেয়েছি। এর পাশাপাশি অনেক কিছু করার সুযোগ আমার ছিল কিন্তু সেটা আমি করিনি। শুধু গান নিয়ে ছিলাম বলেই গানের প্রতি মনযোগটা পুরোমাত্রায় ছিল। তাই আমার ক্যারিয়ারের দীর্ঘ সময়ে কয়েক দফা পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে আপডেট রাখার চেষ্টা করেছি। যখন যে ধরনের মিউিজিকের প্রচলন ছিল তখন সে ধরনের মিউজিক করার চেষ্টা করেছি। শ্রোতা-দর্শকদের রুচি ও মেজাজ অনুধাবন করার চেষ্টা করেছি। আমি যদি গানের প্রতি ডিভোটেড না হতাম তাহলে সেটা সম্ভব হতো না।

অনেকেরই মন্তব্য শুধু গান নয়, আপনার টিকে থাকার মূল চালিকাশক্তি হচ্ছে গ্ল্যামার। এই গ্ল্যামারকে পুঁজি করেই এখনও সঙ্গীতাঙ্গনে রাজত্ব করে যাচ্ছেন?
(হেসে) একটা গ্ল্যামার এতদিন ধরে দেখতে কি কারো ভালো লাগার কথা! তাছাড়া মানুষ গ্ল্যামার দেখে নায়িকাদের। আমিতো গায়িকা। শুধু গ্ল্যামার দিয়েই কি শ্রোতা-দর্শকদের ধরে রাখা সম্ভব। এখনতো বেশির ভাগ শিল্পীরই গ্ল্যামার এবং স্মাটনেস লক্ষ্যণীয়। কিন্তু তাতে কি তারা রাতারাতি তারকা বনে যেতে পারছেন। অবশ্যই না। যে কোন শিল্পীর জন্যই গ্ল্যামার হলো একটা প্লাস পয়েন্ট। সঙ্গীতের ভিত্তি না থাকলে শুধু গ্ল্যামার দিয়ে কিছু করা অসম্ভব শ্রোতা-দর্শক আমাকে ভালোবাসে বলেই এখনও আমি গান করছি। আর গ্ল্যামার কথা যদি এসেই যায় তাহলে সেটাওতো আমার নিজের, তাই না। কারো কাছ থেকে তো ধার করা না।

মঞ্চে আপনার জনপ্রিয়তা অনেকের কাছেই ঈর্ষণীয়। লক্ষ্যনীয় যে, এই প্রজন্মের অনেক জনপ্রিয় তারকাও মঞ্চে আপনার মত ব্যস্ত নন, ক্যারিশমাটা আসলে কি?
স্টেজ এর সবচেয়ে বড় বিষয় হলো স্থান-কাল ভেদে সেখানকার শ্রোতা-দর্শকদের পছন্দ বোঝার ক্ষমতা থাকতে হবে একজন শিল্পীর। আমি যখন থেকে গান গাওয়া শুরু করেছি তখন থেকেই মঞ্চে গান করি। সেটার ধারাবাহিকতা এখনও বজায় রেখেছি। দিন যতোই গড়িয়েছে আমি ততোই ম্যাচিওর হয়েছি। মূল কথা হলো, কোন কিছু ভালোভাবে মন থেকে করলে সেটার রেজাল্টও ভালো হয়। মঞ্চে আমার গান করতে ভালো লাগে, তাই শ্রোতা-দর্শকদের কাছেও আমার চাহিদা রয়েছে। তবে ইদানীংকার অনেক শিল্পীই মঞ্চে খুব ভালো করছে। এই জেনারেশনকে আমি খুব উৎসাহ দেই।

এখনকার সঙ্গীতের সার্বিক অবস্থা সম্পর্কে আপনার মন্তব্য কি?
টেকনোলজির দিক থেকে আমরা অনেক এগিয়েছি। অনেক মেধাবী শিল্পী রয়েছে আমাদের। কিন্তু একজন শিল্পীর সৃষ্টি অর্থাৎ গান প্রকাশের সিস্টেমটা পাল্টে গেছে বিধায় প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও ক্লিক করতে পারছে না। তাছাড়া এখন গান গাওয়ার পাশাপাশি মিউজিক ভিডিওটাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। এখন ইউটিউব-এ মিউজিক ভিডিও রিলিজ হয়। হয়তো ভিউ বেশি হয়। কিন্তু শিল্পীরা আশানুরূপ লাভবান হয় না। আগে অডিও কিংবা সিডির সময় আমরা এককালীন একটা সম্মানী পেতাম। যদিও রয়্যালিটির বিষয়টি বরাবরই আমাদের দেশে গোলমেলে। তবুও সিডি প্রকাশের সিস্টেমটাই আমার কাছে সুবিধাজনক বলে মনে হয়। একজন শিল্পী একটি অ্যালবামে ১০/১২ টি বিভিন্ন মেজাজের গান দিয়ে নিজের গায়কী প্রকাশ করতে পারে। কিন্তু ইউটিউব-এ হঠাৎ হঠাৎ একটি গান করে ঠিক তৃপ্তি পাওয়া যায় না। আসলে ইউটিউব এ পাওয়া জনপ্রিয়তা ভার্চুয়াল। আসল জনপ্রিয়তা নয়। রুট লেভেলে এ জনপ্রিয়তা পৌছানো দুষ্কর। তাছাড়া ইউটিউব এ কোন গান প্রকাশ করতে হলে সাথে ভিডিওটাও অপরিহার্য। অনেকের পক্ষেই অনেক টাকা খরচ করে ভিডিও করাটা সম্ভব হয় না। আবার বিদেশে বড় বড় স্পন্সর রয়েছে, কিন্তু আমাদের দেশে তা অতি নগন্য। সবকিছু মিলিয়ে বর্তমানে আমাদের সঙ্গীতের অবস্থা খুব একটা ভালো বলা যাবে না। শিল্পীদের স্থায়িত্ব খুবই কম। বাংলা গানের ঐতিহ্য ধরে রাখতে হলে এ অবস্থা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। প্রকাশের মাধ্যমটা অনেক ছোট হয়ে গেছে। ইউটিউব হয়তো সময়ের দাবি কিংবা প্রযুক্তির উন্নত ধাপ। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়, একটা শিল্পীর পরিপূর্ণ অ্যালবাম থাকা উচিত। সিডি, সিডি প্লেয়ার থাকতে হবে। মানুষকে আবার অ্যালবাম কিনে গান শুনতে হবে। এরকম না হলে সঙ্গীতে নতুন করে লিজেন্ড তৈরি হওয়া দুষ্কর হয়ে যাবে।

কিছুদিন আগে আঁখি আলমগীর ম্যানচেষ্টারে রোহিঙ্গাদের সাহায্যার্থে একটি ফান্ড রেইজিং প্রোগ্রাম করে দেশে ফিরেছেন। কক্সবাজারে গিয়ে আয়োজক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সে ত্রাণ রোহিঙ্গাদের মাঝে বিতরণ করে প্রশংসিতও হয়েছেন। সর্বশেষ প্লেব্যাক করেছেন ‘একটি সিনেমার গল্প’ ছবিতে। আর সর্বশেষ মিউজিক ভিডিও ‘টিপ টিপ বৃষ্টি’। জনপ্রিয় গায়ক আসিফ আকবরের সঙ্গে ডুয়েট এই গানটি ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে। গত ঈদে রিলিজ হয়েছে আরটিভি মিউজিক থেকে আসিফের সঙ্গে আরেকটি ডুয়েট ‘ও পাখিরে’ শিরোনামে। গানটির কথা লিখেছেন সুহৃদ সুফিয়ান, সুর ও সঙ্গীত করেছেন জুয়েল মোর্শেদ।

দুই যুগ ধরে সঙ্গীতাঙ্গনে সাবলিলতা ও জনপ্রিয়তা ধরে রাখার অভিজ্ঞতার আলোকে নতুন শিল্পীদের উদ্দেশ্যে আঁখি বলেন, ‘প্রথম শর্ত হলো, নিজেকে স্টার ভাবা যাবে না। বিনয়ী থাকাটা খুবই জরুরী। অবশ্যই সেটা কৃত্রিম নয় মন থেকে। আর ভালো শিল্পী হতে হলে প্রথমেই তাকে ভালো মানুষ হতে হবে। মাথা ঠান্ডা রাখতে হবে। আর প্র্যাকটিসতো কমবেশী সবাই করে। নিজেকে সবসময় আপটুডেট রাখতে হবে। আরেকটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ; যাকে যেটা মানায় তার সেটাই করা উচিত। পাশাপাশি ইমেজকে বারবার ভাঙ্গা যাবে না। মূলতঃ আমার সাফল্যের ক্ষেত্রে এই বিষয়গুলোই কাজ করেছে।

নিজের সম্পর্কে আঁখির অ্যাসেসমেন্ট হলো, ‘শিল্পী সত্ত্বার বাইরে আমি একজন মানুষ। আর মানুষ হিসেবে নিজেকে আরো বেটার করার প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকে। একটি অদৃশ্য আয়নায় আমি নিজেকে সংশোধন করি। ভালো-মন্দ বোঝার চেষ্টা করি। সবার সেটা থাকা উচিত। সবসময় পজিটিভ থাকার চেষ্টা করি। একজন মানুষ হিসেবে আমার দায়িত্ব পালনের চেষ্টা সবসময় থাকে। আমি চাই যখন আমি কাজ করবো না তখন যেন আমার নাম সবার মাঝে বেঁচে থাকে। তাই স্বপ্ন পূরণের জন্য একনিষ্ঠতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছি।

Share.