আত্মহত্যা করতেন সামুরাই যোদ্ধারা!

0
হারা-কিরি বা সেপ্পুকু অনুষ্ঠানে নিজের পেটে তলোয়ার বিধে আত্মহত্যা করছেন এক সামুরাই যোদ্ধা।

 

আমরা সবাই জাপানের সামুরাই যোদ্ধাদের ইতিহাস শুনেছি। জাপানি ইতিহাসের উল্লেখযোগ্য অংশ জুড়ে আছে তাদের অবস্থান। ইতিহাসে তাদের বীরযোদ্ধা বলে মনে করা হয়। কারণ তাদের যুদ্ধে পরাজয়ের ইতিহাস খুব কম। যুদ্ধে পরাজয়কে তারা ঘৃণা করে। তারা কোনো জাতির কাছে পরাজিত হলে নিজের শরীরে তলোয়ার চালিয়ে আত্মহত্যা করে।

প্রায় ১৫০ বছর আগে অস্তিত্ব ছিল। সম্প্রতি তাদের কিছু চিত্তাকর্ষ ছবি পাওয়া গেছে যেগুলোতে তাদের যোদ্ধাজীবন ব্যবস্থার অনেক তথ্য উঠে এসেছে। ফালিসে বেটো নামের এক ফটোগ্রাফার ছবিগুলো তুলেছিলেন।

সামুরাইদের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট হলো, তারা কারো কাছে পরাজিত হলে সে পরাজিত জীবন রাখতেন না। তারা মনে করতেন, এ লজ্জার জীবন রাখার চেয়ে মৃত্যুবরণ করাই শ্রেয়। শত্রুর কাছে পরাজয় বরণ করার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে নিজের পেটে তলোয়ার চালিয়ে আত্মহত্যা করতেন তারা।

সামুরাইরা এই আত্মহত্যাকে খুব সম্মানী চোখে দেখতেন। মাঝে মাঝে তারা এ আত্মহত্যার একটি অনুষ্ঠানও পালন করতেন। অনুষ্ঠানটির নাম হারা-কিরি বা সেপ্পুকু। এ অনুষ্ঠানে পরাজিত ব্যক্তি জনসমুক্ষে আত্মহত্যা করতেন।

সামুরাইছবিটি হারা-কিরি বা সেপ্পুকু অনুষ্ঠানের। এক সামুরাই যুবক (সাদা পোশাকে) পেটে তলোয়ার বিধে আত্মহত্যা করছেন।

৭১০ সাল থেকে সামুরাইদের ইতিহাস সম্পর্কে জানা যায়। ধারণা করা হয় তাদের উৎপত্তিও সে সময় থেকে। তারা জাপানের তোহুকু নামক অঞ্চলে বসবাস করতেন। সামুরাই জনগোষ্ঠীর সৃষ্টির পর থেকেই যুদ্ধ বিদ্যায় খুব সুনাম অর্জন করেন। শতাব্দীর পর শতাব্দী যুদ্ধবিদ্যার সঙ্গে থেকে এক সময় জাতীয় যোদ্ধাতে পরিণত হয়। এক সময় জাপান সরকার তাদের জাতীয় যোদ্ধার সন্মানে সম্মানিত করেন। তারা ১২ শতাব্দী থেকে ১৯ শতাব্দী পর্যন্ত জাপানের শাসকশ্রেণীর সঙ্গে ছিলেন।

সামুরাইনিজের ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও অস্ত্রে সজ্জিত এক সামুরাই যোদ্ধা দল। ছবিটি ১৮৭০ সালে তোলা।

সামুরাইরা কনফুসিয়াসের অলিখিত কিছু যুদ্ধনীতি অক্ষরে অক্ষরে পালন করতেন। আনুগত্যবোধ, আত্মনির্ভরশীলতা, নিয়মানুবর্তিতা, নৈতিকতা ইত্যাদি ছিল তাদের কাছে প্রধান পালনীয় বিষয়। কোনো সামুরাই যদি মনে করতেন তারা এসব মেনে চলতে ব্যর্থ হয়েছেন তাহলে প্রকাশ্যে আত্মহত্যা করতেন তিনি।

সামুরাই১৯ শতাব্দীর এ ছবিগুলো ফালিসে বেটো নামের এক ফটোগ্রাফারের কাছে থেকে সংগ্রহ করা।

একজন সামুরাই বিভিন্ন অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র ব্যবহার করতে পারদর্শী ছিলেন। তার মধ্যে ‘কাতানা’ নামের এক ধরনের লম্বা তলোয়ার খুব প্রিয় ছিল তাদের কাছে। তারা ডান হাতে অস্ত্র ধরতেন। সবসময় দুটি তলোয়ার নিজের কাছে রাখতেন। কোন যুদ্ধ না থাকলে না ‘কাতানা’ এবং ‘ওয়াকিজাশি’ নামক ছোট তলোয়ার দুটি সঙ্গে রাখতেন। তাছাড়া যুদ্ধের সময় ‘তাচি’ নামের লম্বা তলোয়ার এবং ‘টান্তো’ নামের ছোট তলোয়ার সঙ্গে রাখতেন।

সামুরাইঅস্ত্র সজ্জিত কয়েকজন সামুরাই যোদ্ধা। ছবিটি ১৮৬২ সালে ফালিসে বেটোর তোলা।

এজন্য তাদের অস্ত্র সজ্জিত এক পূর্ণ বাহিনী হিসেবে মনে করা হতো। তারপরও দেখা গেছে, প্রাচীন ইউরোপের নাইটদের তুলনায় তারা কম অস্ত্র ব্যবহার করতেন। তবে তারা যেটুকু অস্ত্র ব্যবহার করতেন একেবারের ভয়ঙ্কর অস্ত্রগুলোই ব্যবহার করতেন।

সামুরাইনিজেদের পোশাক ও অস্ত্রে সজ্জিত তিন সামুরাই যোদ্ধা।

সামুরাইরা বিশ্বাস করতেন তলোয়ারই তাদের আত্মাকে ধারণ করে আছে। তাই তলোয়ারই তাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তারা মনে করতনে তলোয়ারকে উপযুক্ত সম্মান না করলে নিজের সম্মানও থাকবে না।

সামুরাইসামুরাইরা এক সঙ্গে কয়েকটি তলোয়ার ব্যবহার করতেন। একটি বড় আর দুটি ছোট তলোয়ার মিলিয়ে তিনটি তলোয়ারও ব্যবহার করতেন তারা।

তারা আরো মনে করতেন, প্রত্যেক তলোয়ারই পরীক্ষা করার জন্য তৈরি করা হয়েছে। যে ব্যক্তি তলোয়ার ধারণ করবেন, তিনি যেকোনো অপরাধীকে হত্যা করে নিজের তলোয়ার পরীক্ষা করে দেখতে পারবেন।

তারা বুশিদোর নীতি অনুসরণ করে জীবন সচল রাখতেন। বুশিদোর প্রতি আনুগত্যবোধ, আত্মনির্ভরশীলতা, নিয়মানুবর্তিতা, নৈতিক আচরণের কারণে যুদ্ধক্ষেত্রেও সম্মানিত হন বলে তাদের ধারণা।

সামুরাইতলোয়ার ও বর্ম হাতে তিন সামুরাই যোদ্ধা।

১৫-১৬ শতাব্দীর দিকে সামুরাইরা ভয়ঙ্কর যোদ্ধা ছিলেন। তারপরই শুরু হয় এডো যুগ। এডো যুগ ছিল ১৬০৩ সাল থেকে ১৮৬৮ সাল পর্যন্ত। এই এডো যুগ থেকেই সামুরাইয়ের শক্তি কমতে শুরু করে। যুদ্ধ বিগ্রহও কমতে তাকে। জাপানে শান্ত পরিবেশ বিরাজ করা শুরু করে। বিখ্যাত বিখ্যাত সামুরাই যোদ্ধারা যুদ্ধপেশা ত্যাগ করে শিক্ষক, শিল্পী ও সরকারের বিভিন্ন আমলার চাকরি নেওয়া শুরু করেন। এভাবে সামুরাইদের সংখ্যা কমে ১৮৬৮ সালে পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যায়।

0 Shares
Share.