বিশ্বকে কাঁদালো শিশু ওমরান (ভিডিও)

0
গত সপ্তাহে সিরিয়ায় আলেপ্পো শহরে বিমান হামলার শিকার হয় ওমরান দাকনিশ নামের এই সিরিয়ান শিশুটি।

মাথায় রক্ত ঝরছে অবিরাম, সারা শরীর ধুলিমাখা, পরনে একটি প্যান্ট ও কার্টুন আঁকা টি-শার্ট। একটি অ্যাম্বুলেন্সে নিথর হয়ে বসে আছে শিশু ওমরান। কোনো কথা বলছে না। বার বার হাত দিয়ে রক্তমাখা মুখ মুছছে আর নিজের রক্ত দেখে নিজেই চমকে ‍উঠছে। অথচ কাঁদছে না। ছোট্ট বুকের ভেতর পাহাড় সমান কান্না নিয়ে ছুটে চলছে হাসপাতালের দিকে। তাও একফোঁটা চোখের পানি ফেলছে না সে।

পরে যখন বাবা-মা হাসপাতালে দেখতে এলেন তখন তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে আর কান্না চেপে রাখতে পারলো না ওমরান। হুহু করে ডুকরে কেঁদে উঠলো। সারা দুনিয়ার কান্না যেন সে সময় সিরিয়ার আকাশ বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছিল। আর বিমান হামলার শিকার সিরিয়ান ছোট্ট শিশু ওমরানকে চেপে ধরেছিল। দুনিয়া কাঁপানো এই ছবিটি প্রমাণ করে মানুষ কতটা নিষ্ঠুর হতে পারে। এই ছোট্ট কঁচি শিশুর নিদারুণ কষ্টও তাদের হৃদয় ছুতে পারে না।

বিমান হামলায় লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে ওমরান দাকনিশদের ভবনসহ আশেপাশের অন্যান্য ভবন।

গত সপ্তাহে সিরিয়ার আলেপ্পো শহরে বিমান হামলার শিকার হয় ওমরান দাকনিশ নামের পাঁচ বছর বয়সী এই সিরিয়ান শিশুটি। তারা যে ভবনে থাকতো বিমান হামলায় তা লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়। কোনো রকমে জীবন নিয়ে যে যেখানে পারে পালিয়ে যায়। এক সময় বাবা-মায়ের কাছে থেকে আলাদা হয়ে যায় ওমরান। বিধ্বস্ত ভবনে প্রায় এক ঘন্টা আটকে থাকে সে। তারপর সেচ্ছাসেবকরা ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করে নিয়ে যায় হাসপাতালে।

উদ্ধারকর্মীরা ওমরান দাকনিশসহ অন্য শিশুদের পাশের হাসপাতালে নিয়ে যান কিন্তু তাদের বাবা-মায়ের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না।

আবু রাজীব নামের সিরিয়ান আমেরিকান মেডিকেল সোসাইটির এক সদস্য বলেন, ‘শিশুটি কোনো কথাই বলছিল না। শুধু তার বাবা মায়ের খোঁজ করছিল। তাদের দেখার আগ পর্যন্ত একটুও কান্না করেনি শিশুটি। নিথর হয়ে বসেছিল। মানুষ ঘুমিয়ে থাকলে যেমন মনে হয় ঠিক তেমন মনে হচ্ছিল তাকে। একেবারে অবচেতন ও ভীত সন্ত্রস্ত।’

হাসপাতালে নেয়ার পর ডাক্তার তাকে দেখে খুব ঘাবড়ে গিয়েছিলেন। কারণ তিনি মনে করেছিলেন মাথায় হইতো বড় ধরনের আঘাত পেয়েছে সে। পরে কয়েকটি ব্যান্ডেজ দিয়ে বিপদমুক্ত করেন তাকে। সংবাদ মাধ্যমগুলো কথা বলতে চাইলে রাজি হয়নি ওমরান। সে খুব ভীতু সন্ত্রস্ত ছিল। বার বার এদিকে ওদিকে তাকাচ্ছিল আর ভয়ে চমকে উঠছিল।

মাথায় আঘাত পেয়ে রক্ত ঝরছে অবিরাম ও ধুলিমাখা শরীরে বসে আছে ওমরান দাকনিশ।

ওমরান বাবা-মা ও তিন ভাইবোনের সঙ্গে বসবাস করতো। অবিশ্বাস্যভাবে এই ভয়ংকর হামলা থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন তার বাবা-মা আর ভাইবোন।ভবনটির শিশুসহ আরও আটজন বিমান হামলার শিকার হয়। ওমরানসহ তারাও গুরুতর আহত হয়।

ওমরানরা যে ভবনে থাকতো তার আশেপাশেই বাস ছিল সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার-আল-আসাদের বিদ্রোহিদের। তাই তাদের বিরুদ্ধে চালানো বিমান হামলা শিকার হয় ওমরানরা। এই ভয়ংকর হামলার পর বিদ্রোহীরা সেখানে আরও প্রতিরোধমূলক পাল্টা হামলা চালায়।

হামলার পর নারী ও শিশুদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়া হয়।

হামলার পর হোয়াইট হেলমেট নামের সিরিয়ান উদ্ধারকর্মীরা আহতদের অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নিয়ে যান। ওমরানের সঙ্গে আরও তিনটি শিশু ছিল।

গত বৃহস্পতিবার হামলার পর তার একটি ভিডিও ধারণ করা হয়। পরে ফেসবুক ইউটিউবসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে তা ছড়িয়ে পড়ে। সারা পৃথিবীর মানুষ ধিক্কার জানায় এই ভয়ংকর হামলার। বিভিন্ন মন্তব্য ও শেয়ারের মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায় ছবি ও ভিডিওগুলো।

ওমরান দাকনিশসহ আরও তিনটি শিশু এই হামলায় আহত হয়। ছবিতে হাসপাতালে আহত অবস্থায় কাঁতরাচ্ছে শিশুটি।

ডেনা নামের এক ব্যক্তি মন্তব্য করেন, ‘বিমান হালমার শিকার হওয়া শিশুটির ভীতসন্ত্রস্ত দৃষ্টি দেখে আমি খুব মর্মাহত হয়েছি। কবে আমরা শিশুদের উপর এমন নির্যাতন বন্ধ করতে পারবো? কখন এটা বন্ধ হবে?’

আবসার নামের এক ব্যক্তি মন্তব্য করেছেন, ‘এরপর আর কোনো হৃদয় বিদারক ভিডিও দেখতে চাইনা। আমাদের জীবন তখনই সার্থক হবে যখন পরবর্তী প্রজন্মের জন্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবো।’

হামলার পর সেখানে থাকা বিদ্রোহীরা পাল্টা গুলি করে তাদের ওপর।

মিরু নামের একজন লিখেছেন, ‘দয়া করে এই যুদ্ধ বন্ধ করো।’

বিদ্রোহীরা রকেট লাঞ্চার ছুড়ে মারে বিমান হামলাকারীদের দিকে।

সেই বিমান হামলার শিকার হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে এক কিশোর।

বিমান হামলায় আহত ব্যক্তিকে চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন এক ডাক্তার।

Share.