খেলাপি ঋণে মুনাফা কমার আশঙ্কা ব্যাংকের

0

ব্যাংকের আয়ের বেশির ভাগই আসে বিনিয়োগ থেকে; কিন্তু বিনিয়োগ স্থবিরতার কারণে আমানত থেকে সংগৃহীত অর্থ কাজে লাগাতে পারছে না তারা। উপরন্তু বিভিন্ন উপায়ে যে পরিমাণ আয় হচ্ছে তার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ চলে যাচ্ছে প্রভিশন সংরক্ষণে। আর বর্ধিত হারে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হচ্ছে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় কারণে। ফলে বছর শেষে নিট আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন ব্যাংকাররা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়ে হয়েছে প্রায় ৬৬ হাজার কোটি টাকা। এর বাইরে জুন পর্যন্ত অবলোপন করা হয়েছে প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ। ব্যাংকের খেলাপি ঋণ অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় বর্ধিত হারে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হচ্ছে। গত সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকগুলো প্রভিশন সংরক্ষণ করেছে ৩২ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকার। যদিও প্রভিশন সংরক্ষণ করার কথা ছিল ৩৭ হাজার ২২৭ কোটি টাকা; কিন্তু কিছু কিছু ব্যাংক যে পরিমাণ আয় করেছে তা দিয়ে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় কাক্সিক্ষত হারে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে পারেনি। ফলে সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকিং খাতে প্রভিশন ঘাটতি হয়েছে প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, গত সেপ্টেম্বর প্রান্তিকের ধারাবাহিকতায় অক্টোবর-নভেম্বরেও খেলাপি ঋণ আদায়ের তেমন উন্নতি হয়নি। ফলে সেপ্টেম্বর প্রান্তিকের ধারাবাহিকতায় ডিসেম্বর প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ বাড়লে বেশি হারে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হবে। একই সাথে মন্দ ঋণ বেড়ে যাওয়ায় এর বিপরীতে অর্জিত আয়ও ব্যাংকের আয় হিসেবে দেখাতে পারবে না। ইতোমধ্যে সেপ্টেম্বর শেষে প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকার আয় স্থগিত করে রেখেছে ব্যাংকগুলো। আর এটা অব্যাহত থাকলে বছর শেষে ব্যাংকের নিট আয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, কয়েকটি কারণে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাচ্ছে। আর এর মধ্যে অন্যতম হলো ইচ্ছেকৃত খেলাপি ঋণ। অর্থাৎ বড় বড় ঋণগ্রহীতা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে আর পরিশোধ করছেন না। দেশের প্রথম প্রজন্মের একজন এমডি জানিয়েছেন, তার ব্যাংকের ৮০ ভাগ ঋণই বড় কয়েকটি ব্যবসায়ী গ্রুপের দখলে আটকে পড়েছে। আর ১৫ ভাগ মাঝারি মানের উদ্যোক্তাদের দখলে। মাত্র ৫ ভাগ হলো ুদ্র উদ্যোক্তাদের দখলে। ওই এমডি জানিয়েছেন, বড় বড় ঋণখেলাপির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। এ কারণে বছরের পর বছর তারা ঋণ পরিশোধ না করে পার পেয়ে যাচ্ছেন। এ কারণেই অন্যরা ইচ্ছেকৃত ঋণখেলাপি হতে উৎসাহিত হয়ে পড়েছেন। এর বাইরে কিছু ঋণখেলাপি আছেন ব্যবসাবাণিজ্যে লোকসানের কারণে ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করতে পারছেন না।

অপর এক ব্যাংকের তহবিল ব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, খেলাপি ঋণের পাশাপাশি তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে ব্যাংকগুলোর। তিনি জানান, ব্যাংকগুলো যে পরিমাণ আমানত সংগ্রহ করছে তার বেশির ভাগই বিনিয়োগ করতে পারছে না। ব্যাংকগুলোর কাছে অলস থেকে যাচ্ছে; কিন্তু নির্ধারিত মেয়াদ শেষে ব্যাংকগুলোকে ঠিকই নির্ধারিত হারে আমানতকারীদের মুনাফা দিতে হচ্ছে। আমানতের অর্থ বিনিয়োগ করতে না পারায় ব্যাংকের তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয় বেড়ে চলছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক পরিসংখ্যান মতে, বর্তমান ব্যাংকিং খাতে বিনিয়োগযোগ্য তহবিল উদ্বৃত্ত রয়েছে প্রায় সোয়া লাখ কোটি টাকা। ব্যাংকের মুনাফা কমে যাওয়ার এটাও একটি কারণ বলে দেখছেন তিনি।

তহবিল উদ্বৃত্ত থাকার কারণ হিসেবে জানা গেছে, ব্যাংকে বিনিয়োগ নেয়ার মতো নতুন উদ্যোক্তা আসছে না। ঘুরে ফিরে আগের উদ্যোক্তারাই আসছে; কিন্তু তাদের বেশির ভাগেরই ঋণ পরিশোধের ইতিহাস ভালো নয়। ফলে কিছু কিছু ব্যাংক অগ্রাসী বিনিয়োগে জড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে নতুন ব্যাংকগুলোর শাখা কম থাকায় তারা অনেকটা বাধ্য হয়ে এসব উদ্যোক্তাকে ঋণ দিচ্ছে। ফলে তাদের খেলাপি ঋণ তিন গুণ বেড়ে গেছে। এ কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নতুন ব্যাংকগুলোকে ইতোমধ্যে সতর্ক করে দেয়া হয়েছে। ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, যে হারে খেলাপি ঋণ বাড়ছে এটা অব্যাহত থাকলে সামনে ব্যাংকিং খাতের জন্য মোটেও সুখকর হবে না।

Share.